
ইনকিয়াদ আহম্মেদ রাফিন,ঝিকরগাছা উপজেলা প্রতিনিধি:
যশোরের ঝিকরগাছায় অন্তঃসত্ত্বা বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী কিশোরী সালেহা (২৫)'র জোরপূর্বক গর্ভপাতে বাধ্য করার ঘটনায় এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র নিন্দা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে । অভিযুক্ত পলাতক হায়দার আলীকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখন অব্দি মামলা না করাই বিচারের দাবিতে একট্টা হয়েছে গ্রামবাসী।
পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলার স্বনামধন্য 'বাবর আলী সরদার বিশেষ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক সৌদি প্রবাসী মো: আব্দুল আলিম। ২৩ আগস্ট (রবিবার) দুপুরে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে এসে তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবন্ধী সালেহা খাতুন ২০১৭সালের জানুয়ারি মাসের ১তারিখে তার পরিচালিত সেবামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ২০২০সালে সালেহা আন্তর্জাতিক দুবাই অলিম্পিক ও ভারতের চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন। ৬০টি বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পক্ষে আমার প্রতিষ্ঠানের দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ওই টুর্নামেন্টে সে আমার দেশের লাল সবুজের পতাকা তুলে ধরেন। টুর্নামেন্টে দেশের সেরা ও মোট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে দেশের গৌরব বয়ে আনেন। অথচ সে বর্বর পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছে। আমরা এই ঘটনার ধিক্কার জানাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর কাছে আমরা সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার দাবি করি।
তিনি বলেন, নিন্দনীয় এই ঘটনার খবর পেয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষক স্বর্ণালী ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের শিক্ষকবৃন্দ তাঁর বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আমার পক্ষ থেকে আইনি সহায়তাসহ সম্ভাব্য সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের জরুরী কাজে ঢাকায় অবস্থান করাই আমি নিজে যেতে না পারলেও শিক্ষকমন্ডলীকে পাঠিয়েছি। প্রধান শিক্ষক আমাকে নিশ্চিত করেছেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক রেহেনা খাতুন, সহকারী শিক্ষক এনামুল হোসেন, সিনিয়র শিক্ষক শাফিয়া খাতুন, সহকারী শিক্ষক ফারজানা ববি তার সাথে ছিলেন।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'স্বজন চক্র'র নির্বাহী পরিচালক প্রভাষচন্দ্র ভক্ত।
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
উল্লেখ্য ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় জড়িত মানুষরূপী নরপশু দুই সন্তানের জনক হায়দার আলী (৪৫)ঘটনা জানাজানির পর থেকে পলাতক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে । অভিযোগে প্রকাশ, একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গর্ভপাত ঘটানোর গোপন চুক্তির ১লাখ ২০হাজার টাকার মধ্যে ৮০হাজার বকেয়া টাকা দিতে অস্বীকার করায় ঘটনাটি কানাঘুষার এক পর্যায়ে গ্রামবাসীর মাঝে প্রতিবন্ধী কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ও গর্ভপাত ঘটানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। শুরু হয় গ্রাম্য সালিশের নামে দেনদরবার। দরকষাকষির এক পর্যায়ে দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি মারামারির মতো ঘটনাও ঘটে।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ঝিকরগাছা উপজেলার নিভৃতপল্লী বাঁকড়া ইউনিয়নের দিগদানা মন্দির পাড়া গ্রামে।
হতভাগী প্রতিবন্ধী কিশোরীর 'মা,ছবি বেগম (৫৫) অভিযুক্তকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
ভিকটিমের মা ছবি বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়েসহ বড় ছেলেটিও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী!
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন,লম্পট হায়দার আমার নিকট আত্মীয়। পরিচয় দিতে লজ্জা করে। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি আমার বোবা মেয়ের সহজ-সরলতার সুযোগ নিয়ে এত বড় সর্বনাশ করবে।
জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমার মেয়ের শারীরিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। বাঁকড়া বাজারের একতা মেডিকেল সার্ভিসে আল্ট্রাসনো করার পর ডাক্তাররা আমাকে জানায় সালমা প্রায় চার মাসের গর্ভবতী। এ পর্যায়ে সে আমাকে আকার ইঙ্গিতে হায়দারকে অভিযোগ করে। বিষয়টি আশপাশের জ্ঞাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবেশীরাও কানাঘুষা ও সন্দেহ করতে থাকে। একদিকে হায়দারের চাপাচাপি অন্যদিকে লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তাকে ক্লিনিকে নিয়ে গর্ভপাত ঘটানোয় রাজি হয়ে যাই। তিনি করুন আকুতি জানিয়ে বলেন "আমার কেউ নেই, বিচার চাওয়ার জায়গাও নেই। আপনাদের কাছে বিচার চাই"।
নিন্দনীয় এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন ভিকটিমের নিকট প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা।
ভিকটিম সালমা বেগম লম্পট হায়দার আলীর আপন চাচাতো বোনের মেয়ে। সম্পর্কে সে হয় সালমার মামা!
২২ আগষ্ট (রবিবার) সকালে সরেজমিন এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়, দিকদানা মন্দির পাড়ার কপোতাক্ষ সাঁকো পাড়ের চা দোকানী চল্লিশোর্ধ আমির আলী,নিকট প্রতিবেশী ষাটোর্দ্ধ নজরুল ইসলাম,ভিকটিমের খালা শাহিদা বেগম (৩৫),ভিকটিমের খালু নজরুল ইসলাম (৪৫)আবুল কালাম (৫৫),জাকারিয়া (৪০)সহ অনেকের সাথে। অভিযুক্ত হায়দারের আপন চাচতো ভাই ইয়াকুব আলী (৪৮) ঘটনার তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, 'সে আমার ভাই হলেও আমি অভিযুক্তর বিচার চাই। ও একটা অমানুষ, ওর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ'।
অভিযোগের সত্যতা জানতে বাঁকড়া বাজারের একতা মেডিকেল সার্ভিসের পরিচালক আরিফ বিল্লাহর সাথে কথা হয়। তিনি তার ক্লিনিকে অবৈধ কোন গর্ভপাত ঘটানোর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে দাবি করে বলেন,গত ২৯জুলাই বেলা ১১টায় তার ক্লিনিকে সালমা নামে এক রোগীকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। এখানে কর্মরত গাইনি রোগীর চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ডা: ফেরদৌস ফারজানা তাকে আলট্রাসনোগ্রাম করেন।পরীক্ষায় সালমা চার মাস দশ দিনের অন্তঃসত্তা বলে নিশ্চিত হন ডাক্তার। কিন্তু, তার স্বামী না থাকায় কিশোরী মাতাকে গর্ভপাত ঘটানোর তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। একই সাথে তার শারীরিক সুস্থতায় কিছু পরামর্শ দিয়ে বিদায় করা হয়। অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাতের ঘটনার সাথে তার ক্লিনিকের কেউ জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ভিকটিমের মায়ের অভিযোগে জানা যায়, একতা ক্লিনিকে কর্মরত নার্স খাদিজা বেগম পরে ওই ভিকটিম ও তার মায়ের সাথে নিয়ে শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়ার পার্শ্ববর্তী সাতমাইল বাজারের পার্শ্ববর্তী 'মাতৃসেবা' ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোটা অংকের অর্থের চুক্তিতে প্রতিবন্ধী কিশোরী মাতা সালমার গর্ভপাত ঘটানো হয়।
এ ব্যাপারে বেসরকারি মাতৃসেবা ক্লিনিকের পরিচালক ধাত্রীবিদ্যায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী নাসরিন সুলতানা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে দাম্ভিকতার সাথে বলেন,''আমি কারো কাছে ডকুমেন্টারি কথা বলতে রাজি নই"। তাঁর ক্লিনিক চেম্বারের টেবিলে রাখা নেম প্লেটে লেখা ডা: নাসরিন হক (এস.এম.এফ.বি) তাঁর নামের আগে ডাক্তার লেখার সুযোগ আছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ছিলেন নিরুত্তর।
এ ব্যাপারে বাঁকড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ কাজী মো: শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এমন কোন ঘটনা তার জানা নেই। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। বাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার আনিস উর রহমান বলেন, একজন অসহায় প্রতিবন্ধী কিশোরীর প্রতি এমন জঘন্য ও পৈশাচিক ঘটনা মেনে নেয়া যায়না।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রবিউল হাসান
অনলাইন ইনচার্জঃ কবির মাহমুদ
অফিসঃ ফায়েনাজ টাওয়ার, ৮/এ,কালভার্ট রোড,পুরানা পল্টন, ঢাকা