
ইনকিয়াদ আহম্মেদ রাফিন,ঝিকরগাছা উপজেলা প্রতিনিধি :
নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আর্তমানবতার সেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে যশোরের ঝিকরগাছার ‘স্বর্ণালী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’টি।
দুবাই আন্তর্জাতিক স্পেশাল অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী পদক বিজয়ী দু’জন প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন।বিদেশের মাটিতে তুলে ধরেন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা।
২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্পেশাল এই অলিম্পিকে সাঁতার ও ফুটবল প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হয় এই আন্তর্জাতিক স্পেশাল অলিম্পিক প্রতিযোগিতা। এতে ঝিকরগাছার ‘বাবর আলী সরদার স্বর্ণালী প্রতিবন্ধী’ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী উপজেলার দিকদানা-খোসাল নগর গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক মশিয়ার-আমেনা দম্পতির বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়ে মোছা: সুমি খাতুন ও একই গ্রামের দিনমজুর নুরুদ্দিনের মেয়ে সালেহা খাতুন অংশগ্রহণ করেন।সালেহা খাতুনের পাঁচ সদস্যের পরিবারের পিতা-মাতাসহ সকলেই প্রতিবন্ধী!
প্রতিবন্ধী এই বিদ্যালয়টি অবহেলিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
২০১৪ সালে উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নের রঘুনাথ নগর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কপোতাক্ষ তীরে ছায়াঘেরা এক মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে এই বিদ্যালয়টি।
প্রতিষ্ঠাকালে মাত্র ১০জন প্রতিবন্ধীকে নিয়ে পথচলা শুরু বিদ্যালয়টির। একটি দোচালা গোয়াল ঘরে শুরু হয় এর পাঠদান। বর্তমানে ৫৭শতক দানকৃত জমিতে বিদ্যালয়টিতে রয়েছে নয়টি শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, অফিস কক্ষ ও নিরাপত্তা সীমানা প্রাচীর বেষ্টিত প্রধান ফটক।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় সাড়ে ৪শ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের পাঠদানের পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ,ফুটবল, বাস্কেটবল,ভলিবল, দৌড়,সাঁতার,বৌচিসহ নানা ধরনের খেলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সাংস্কৃতিক বিষয়ক তাদের বিশেষ কোর্স চালু রয়েছে।
দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। তাদের শিক্ষা সামগ্রীসহ লেখাপড়ার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে রয়েছেন ৮জন উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। এরা সবাই মাস্টার্স সার্টিফিকেটধারী ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্নকারী।
বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যাচেলর অফ স্পেশাল এডুকেশন (বিএসইডি) বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা: রেহেনা খাতুন জানিয়েছেন, ৮জনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চৌকস সহকারি শিক্ষকদের সমন্বিত উদ্যোগে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ‘বাকশ্রবণ,দৃষ্টি,বুদ্ধি বিষয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ পাঠদানের পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন চলে। তিনি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের উপর গুরুাত্বরোপ করে বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরী। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণে আমাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জনবল কাঠামো, আর্থিক ও লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি করা দরকার।
জনবল কাঠামো সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে ১২জন থেরাপিস্ট,সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকসহ এখনো অন্তত ৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সৌদি প্রবাসী আব্দুল আলিম আক্ষেপ করে বলেন, মানবতার সেবার ব্রত নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও আর্থিক ব্যয়ভার কাঁধে নিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি দান করে তিলে তিলে গড়ে তোলেন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি। এযাবৎ প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করেছেন দাবি করেন তিনি। ফলশ্রুতিতে ১০জন শিক্ষার্থীর স্থলে এখন প্রায় সাড়ে ৪’শ শিক্ষার্থী রয়েছে এখানে। সমগ্র দেশের মধ্যে এ ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় দাবি করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সময়ে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে এসেছেন। নীতিমালা অনুযায়ী সকল শর্ত পূরণ করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন,ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। উন্নয়ন ও আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু,অদ্যাবধি কোন আর্থিক সহায়তা পায়নি। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হাওয়ায় সম্ভাবনাময় এই প্রতিষ্ঠানটি একার পক্ষে টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়েছে বলেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: তোফাজ্জল হোসেন প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের জোরদাবি জানিয়ে বলেন ,আর্তমানবতার সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানটিতে শুধুমাত্র ঝিকরগাছা উপজেলার প্রতিবন্ধীরা নয়, পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার অনেক ছেলেমেয়ে এখানে ভর্তি রয়েছে।
Leave a Reply