
ছাম্মি আহমেদ আজমীর : বই পড়ার অভ্যাস যখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই সময় নতুন প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিয়ে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সিরাজগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত বীরমুক্তিযোদ্ধা আ ফ ম মাহবুবুল হক পাঠাগার। পাঠাগারটি স্থাপিত হয় ২০২১ সালের ১ মার্চ সিরাজগঞ্জ শহরের মুজিব সড়ক রোডস্থ চৌরাস্তা মোড়ে সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাব ভবনের ২য় তলায়। পাঠাগার আজ শুধু একটি পাঠাগার নয় এটি হয়ে উঠেছে সৃজনশীলতা,জ্ঞান অন্বেষণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানবিকতায় স্বপ্নে শিশুকিশোরদের জীবন গড়ার এক আলোকিত ঠিকানা। বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু- এই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করে পথচলা শুরু পাঠাগারটির। শুরু থেকেই শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মাঝে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্নটি ক্রমে ক্রমে আজ বিশাল এক অর্জনে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এই পাঠাগারে পাঠক সংখ্যা ৯৩২ জন। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা ৫ হাজার ৬০০ শত ছাড়িয়ে গেছে। বলা যায় ছোট্ট অথচ বইয়ে সমৃদ্ধ একটি সংগ্রহশালা। এখানে বই শুধু সেলফে কাচের ঘেরায় বন্দী নয়। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টি বই লেনদেন হয়। পাঠক পছন্দের বই উত্তোলন করে নিজ বাসায় সুবিধাজনক সময়ে পড়ে আবার ফেরত দেয়। অনেকেই পড়াশোনার ফাঁকে পাঠাগারে বসে বই পড়ে।সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া বিষয় হলো এই পাঠাগারে ১ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো মাসিক চাঁদা নেওয়া হয় না। এমনকি বই নেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না। কারণ এই পাঠাগার কতৃপক্ষের বিশ্বাস জ্ঞান অর্জনের পথে অর্থ নয় প্রয়োজন ভালোবাসা ও সুযোগ। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। প্রতি শুক্রবার বন্ধ থাকলেও সপ্তাহের অন্যদিনগুলোতে শিক্ষার্থী তরুণ চাকরি প্রত্যাশী ও বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর থাকে পুরো পরিবেশ। বইয়ের পাতায় পাতায় তারা খুঁজে নেয় ভবিষ্যতের স্বপ্ন, জীবনের প্রেরণা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা।জাতীয় পর্যায়েও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে পাঠাগারটি। মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছে পাঠাগারের পাঠকগণ। এবছর মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর আয়োজিত আলী যাকের মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশসেরা দশম স্থান অর্জন করেছে এই পাঠাগার। এছাড়াও পাঠাগারের দুইজন পাঠক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশসেরা পঞ্চম স্থান অর্জন করে সিরাজগঞ্জবাসীকে গর্বিত করেছে।
এবিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ফ ম মাহবুবুল হক পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন বলেন,বই মানুষকে আলোকিত করে। বই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে শেখায়। আমরা চেয়েছি নতুন প্রজন্ম যেন মোবাইল আর প্রযুক্তির ভিড়ে বই থেকে দূরে সরে না যায়। সেই স্বপ্ন থেকেই এই পাঠাগারের জন্ম। শুরুতে অনেক কষ্ট সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম ছিল। কিন্তু আজ যখন দেখি শিক্ষার্থীরা বই পড়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করছে তখন মনে হয় আমাদের পরিশ্রম ক্রমেই সার্থক হচ্ছে। তিনি বলেন ভবিষ্যতে এই পাঠাগারকে আরও সমৃদ্ধ করে একটি আধুনিক জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই যেখানে নতুন প্রজন্ম বই পড়ে সৃজনশীল যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে সততার সাথে দেশ সেবা এবং পরিবারের সেবা করবে। তারা ইতিহাস সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধে আলোকিত মানুষ হয়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন,অতীতের সংগ্রাম,বর্তমানের সাফল্য আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব মিলিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ফ ম মাহবুবুল হক পাঠাগার আজ সিরাজগঞ্জের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবান্ধব অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা এই পাঠাগার যেন আগামী দিনেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
তিনি প্রত্যাশা করেন সমাজের মুল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ এবং সরকারি,বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাঠাগারটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সমৃদ্ধ করতে পাশে থাকবেন।
প্রতিবেদন তৈরির জন্য পাঠাগারে গেলে দেখা যায় পাঠাগার সদস্য সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক হারুন অর রশিদ খান হাসান ও অন্যান্য পাঠক পাঠিকা বৃন্দ বই পড়ছেন।
Leave a Reply