
শফিকুল ইসলাম,সাভার প্রতিনিধিঃ সাভারের উলাইল এলাকায় আল মুসলিম গ্রুপের ৩টি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় দুই সহস্রাধিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের জেরে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। আজ শনিবার (৬ জুন) সকালে কাজে যোগ দিতে এসে কারখানার মূল ফটকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তারা। একপর্যায়ে পাওনাদির দাবিতে তারা কারখানার সামনে অবস্থান নেন এবং পার্শ্ববর্তী ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
শিল্প পুলিশ ও শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, আল মুসলিম গ্রুপের একেএম নীট ওয়্যার, আল মুসলিম বিল্ডার্স, অ্যাপারেলস, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, ওয়াশিং, ইয়ার্ন ডাইং এবং রেডিও কলোনি এলাকায় অবস্থিত প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার লিমিটেড কারখানা থেকে মোট ১,৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করে একটি তালিকা ঝুলিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। নোটিশে ছাঁটাইয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ বা পাওনাদি পরিশোধের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের ছুটি কাটিয়ে চাকুরিতে পুনর্বহালের আশায় কারখানায় ফিরে এমন আকস্মিক নোটিশ দেখে অনেক শ্রমিক কান্নায় ভেঙে পড়েন। হাসনা হেনা, তাহমিনা ও মিরন হোসেনসহ একাধিক ভুক্তভোগী শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আমাদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমাদের অনেকের ওভারটাইম, বোনাস ও বকেয়া বেতন বাকি রয়েছে। এই মুহূর্তে চাকরি চলে গেলে আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াব, কীভাবে সংসার চালাব? শ্রমিকরা তাদের বকেয়া, বোনাস, ওভারটাইম এবং শ্রম আইন অনুযায়ী ৩ মাস ১৩ দিনের বেতনসহ সব ধরনের আইনগত পাওনাদি অবিলম্বে বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর হুঁশিয়ারি ও আইনি প্রশ্ন এই ছাঁটাইকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক অ্যান্ড শিল্প ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২০ ধারা লঙ্ঘন করে এভাবে গণছাঁটাই করা যায় না। এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। আমরা অবিলম্বে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল এবং নিয়মানুযায়ী পাওনাদি বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
ঘটনার প্রতিবাদে শ্রমিক সংগঠনগুলো ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পুনর্বহাল করা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মোঃ আবু রায়হান বলেন, বিদেশী বায়ারদের (ক্রেতা) কাছ থেকে পর্যাপ্ত কাজের অর্ডার না থাকার কারণে এই ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে শ্রম আইন অনুযায়ী এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া কতটুকু বৈধ, সে বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রম আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে ও শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ করা হয়েছে। তারপরেও যদি কেউ পাওনাদি পেয়ে থাকে তার বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের সকল আইনগত পাওনাদি যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে কারখানায় নতুন অর্ডার এলে তখন নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে ছাঁটাইকৃত এই শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও এলাকায় থমথমে অবস্থা, বিক্ষোভের খবর পেয়ে সাভার মডেল থানা ও শিল্প পুলিশ সাঁজোয়া যান ও জলকামানসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। বর্তমানে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উলাইল ও রেডিও কলোনি এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
Leave a Reply