
ডেস্ক রিপোর্টঃ আফজাল হোসেন সরকার ১৯২৭ সালের ১ লা আগষ্ট তৎকালীন পাবনা জেলাধীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার অন্তর্গত কাজিপুর থানার চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাহমুদ আলী সরকার ও মাতা ছিলেন বেগম আয়াতুন্নেছা।
খুব অল্প বয়সে পিতা মাতাকে হারিয়ে বড় বোনের কাছে লালিতপালিত হন মরহুম আফজাল হোসেন সরকার। ছোটোবেলা থেকেই খুব জেদি ও ডানপিটে স্বভাবের হওয়ার কারণে পিতা-মাতাহীন একমাত্র আদরের ছোটো ভাইয়ের কোনো আবদারই অপূর্ণ রাখেননি তাঁর বোনেরা। নিজ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে মেঘাই. ই. ইউ. আই উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান স্কুল তিঁনি ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের মাত্র তিনটি চিকিৎসা শাস্ত্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল স্কুলে’ ভর্তি হন (বর্তমান- ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ)। কিন্তু রাজনৈতিক কারনে সেখানে লেখাপড়া শেষ না করেই তাঁকে এলাকায় ফিরে আসতে হয়। মানবদরদী ব্যক্তিটি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদের সাথী হয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ এই মানুষটি খুবই সৎ, সাহসী ও আত্নপ্রত্যয়ী ছিলেন। এলাকার গণ-মানুষের কাছে তিঁনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে যোগদানের পূর্বে তিঁনি কিছুদিন সেটেলমেন্ট বিভাগে সরকারি আমিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মুসলিম লীগের রাজনীতি দিয়ে তিঁনি সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। পাকিস্তান আমলে তিঁনি কয়েকবার চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৬৫ সালে তিঁনি চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রতিপক্ষ গ্রুপের অনাস্থার কারনে মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন নাই। মুসলিম লীগ করলেও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষেই তাঁর অবস্থান ছিলো। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে অন্যান্য মুসলিম লীগার ও চেয়ারম্যান মেম্বরদের মতো তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হয়নি বরং মুক্তিযোদ্ধাদের তিঁনি নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, নিজ হাতে খাবার দিয়েছেন, স্বার্বিক সহযোগিতা করেছেন। যুদ্ধের সময় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ চালিতাডাঙ্গা গ্রামের প্রায় সকল হিন্দুরা বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র, ক্ষেতের ফসলাদি ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায়। সেই সময় তিঁনি গ্রামের মানুষদের সংগঠিত করে সেইসব বাড়ি-ঘর পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করায় হিন্দুদের সহায়-সম্পদ লুটতরাজ হতে রক্ষা পায়। কতিপয় হিন্দু যারা গ্রামেই ছিল তারা সহ অন্যান্য এলাকা থেকে আগত হিন্দুরা তাঁর বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ইন্ডিয়া থেকে দেশে ফিরলে তিঁনি অক্ষত অবস্থায় প্রত্যেককে তাদের ঘর-বাড়ি, সহায়সম্পদ, জমিজমা থেকে প্রাপ্ত ফসলাদি বুঝিয়ে দেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে তিঁনি আবারও চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং কাজিপুর থানা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর অত্যন্ত দাপট ও সুনামের সাথে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসাবে গৌরবান্বিত হন। এসময় তিঁনি পাবনা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন। তিঁনি সিরাজগঞ্জ মহুকুমা চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ছিলেন এবং পাবনা জেলা চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ছিলেন।
তিঁনি খুব কড়া শাষক ও ন্যায় বিচারক ছিলেন। তাঁর সময়ে কাজিপুরে মামলা মোকদ্দমা খুব কম হতো। বেশিরভাগ ঘটনা তিঁনি স্থানীয় বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতেন। সেই আমলে তিঁনি পার্শ্ববর্তী স্থলবাড়ি গ্রামের (গ্রামটি যখন চোরের গ্রাম হিসেবে স্বীকৃত ছিল) চোরদের কঠিন শাস্তি দিয়ে, সহযোগিতা করে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে চুরি পেশা বাদ দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত এনেছিলেন এবং সাধারন গ্রামবাসিদের চোরের অপবাদ হতে মুক্ত করেছিলেন।
আফজাল হোসেন ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের (জাগদল) কাজিপুর থানা কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি। পরবর্তীতে জাগদল বিলুপ্ত করে ১৯৭৮ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠিত হলে তিঁনি কাজিপুর থানা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিঁনি বৃহত্তর পাবনা জেলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ব্যাক্তি আফজাল হোসেন সরকারকে স্ব নামেই চিনতেন।
আফজাল হোসেন সরকার একজন শিক্ষানুরাগী মানুষ ছিলেন। তিঁনি নিজ উদ্যোগে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ১৯৬৮ সালে চালিতাডাঙ্গায় বিবিএন বহুুুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা কাজিপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হাইস্কুল সংলগ্ন একটি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পার্শ্ববর্তী দুর্গতিয়াপাড়া গ্রামে আরও একটি প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেন। তিঁনি মেঘাই কলেজ (সরকারি মনসুর আলী কলেজ) প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এবং কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সদস্য ছিলেন। কলেজটি দ্রুত সরকারি অনুদানভুক্ত করার জন্য তিঁনি কলেজ কমিটির মিটিংয়ে কলেজটিকে সেই সময়ের মাননীয় মন্ত্রী, কাজিপুরের কৃতিসন্তান এম মনসুর আলীর নামে নামকরনের প্রস্তাব করেন এবং কলেজটি মেঘাই কলেজ হতে মনসুর আলী কলেজ, মেঘাই নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিঁনি ১৯৮৪ সালে ‘কাজিপুর থানা শিশুকল্যান ট্রাষ্টি বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে কাজিপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। সরকারি ভাবে বৃত্তি পরীক্ষার বাইরে বেসরকারি ভাবে এমন একটি উদ্যোগ সেইসময় বাংলাদেশের কোথাও কেউ এমন চিন্তাও করেন নাই। পরবর্তীতে চতুর্থ শ্রেনীর পাশাপাশি সপ্তম শ্রেনীর বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হতো, যা ছিলো কাজিপুরের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনীর বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের আগের বছরে মানসিক প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা।
তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, চালিতাডাঙ্গায় ইউনিয়ন পরিষদ ভবন (পুুুুরাতন), সরকারি খাদ্যগুদাম, দাতব্য চিকিৎসালয়, বিআরডিবি গুদাম, পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, মসজিদ, কৃষি ব্যাংকের শাখা স্থাপন। কাজিপুরের পশ্চিম এলাকার মানুষের আর্থিক লেনদেনের সুবিধার জন্য তিঁনি তাঁর বাল্যবন্ধু সেই সময়ে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক মরহুম সামছুল আলামিনের সহযোগিতায় ১৯৭৯ সালে সোনামুখি বাজারে সোনালী ব্যাংকের শাখা স্থাপন করেন।
ক্ষনজন্মা এই মানুষটি সারাজীবন কাজিপুরের মানুষের সুবিধা অসুবিধার কথা চিন্তা করেছেন এবং তাদের জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৮০/৮১ সালে কাজিপুর থানা যমুনা গর্ভে বিলীন হয়ে গেলে প্রশাসনিক কাজ কর্মের জন্য নতুন স্থান নির্ধারণের কাজ শুরু হয়। তখনকার কাজিপুরের প্রশাসনের কর্মকর্তারা কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশে অস্থায়ী প্রশাসনিক এলাকা পাটাগ্রাম কে নির্ধারণ করে যা কাজিপুরের একেবারে দক্ষিন প্রান্তে অবস্থিত। কাজিপুরের সকল মানুষের সুবিধার্থে কাজিপুরের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে আফজাল হোসেন আলমপুর মৌজায় (বর্তমান উপজেলা পরিষদ) প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেন। এবং ব্যাক্তি আফজাল হোসেন ক্ষমতাধর প্রশাসনের আমলাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর সহায়তায় দীর্ঘ সংগ্রাম করে অবশেষে ১৯৮৪ সালে আলমপুরের মাটিতেই উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ভিত্তি স্থাপন ও কার্যক্রম শুরু করতে সফলকাম হন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেইসময় উপজেলার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অন্যকারো নামে ফলক উন্মোচিত হয়েছিল।
আফজাল হোসেন সরকার ১৯৫৩ সালে বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের শ্যামলী_সরকারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যাক্তি জীবনে সহধর্মিণী বেগম শ্যামলী আফজাল ও ছয় সন্তান রেখে গেছেন যারা সবাই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। স্বামীর স্মৃতি ধরে রাখতে বেগম শ্যামলী আফজাল ছেলে-মেয়েদের সহযোগিতায় ১৯৯৪ সালে চালিতাডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করেন আফজাল হোসেন মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজ যা কাজিপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত।
মহান এই কর্মবীর ও জনহিতৈষী মানব
১৯৯০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারী গোধুলি লগ্নে প্রিয়তমা স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ছয় সন্তানকে তার হেফাজতে দিয়ে, অসংখ্য গুনগ্রাহী তথা দলমত নির্বিশেষে সকলকে কাঁদিয়ে পরলোকগমন করেন।
মৃত্যু নামক শব্দ দিয়ে ইহলোকের পরিসমাপ্তি হলেও সাফল্য ও গৌরবান্বিত কর্মময় জীবনের কারণে তিনি কাজিপুর বাসীর কাছে আজীবন শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন।
Leave a Reply