
রাজধানীর বাজারে এখন এক অদ্ভুত সমীকরণ—ভালো মানের এক হালি লেবুর দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আর ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের এক ডজন (১২টি) ডিম ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। অর্থাৎ একটি হালি লেবু কিনতে যে টাকা লাগছে, সেই টাকায় এখন এক ডজন ডিমও পাওয়া যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার শুরু হলো পবিত্র রমজান মাস। কিন্তু রোজা শুরুর আগেই ঢাকার বাজারে নিত্যপণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। লেবু, বেগুন, শসা, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা মরিচ, খেজুর, ব্রয়লার মুরগি, মাছ—সব মিলিয়ে ইফতারির টেবিলে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ।
গতকাল বুধবার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার, আগারগাঁও তালতলা বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
রমজানে ইফতারের সময় অনেকেই লেবুর শরবত পান করেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে লেবুর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
আগে মাঝারি আকারের এক হালি লেবু ২০ থেকে ৪০ টাকায় কেনা যেত। এখন সেই লেবু ৬০ টাকার নিচে নেই। আর ভালো মানের ও বড় আকারের এক হালি লেবু কিনতে লাগছে ১২০ টাকা—মানে একটি লেবুর দামই প্রায় ৩০ টাকা।
গত বছর রোজা শুরুর আগে এক হালি লেবুর দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
কৃষি মার্কেটের সবজি বিক্রেতা আব্বাস আকন্দ বলেন, মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে। হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় দাম বেড়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, চাহিদা বাড়ার সুযোগে আড়তে দাম বেড়েছে, আর খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি দামের চেয়ে ১০-২০ টাকা লাভ রাখছেন।
ইফতারি তৈরিতে শসা, বেগুন, টমেটো, গাজরের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বাজার।
বেগুনের কেজি ৮০-৯০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১৩০-১৫০ টাকা।
শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়।
টমেটো ও গাজরের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।
পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা, যা কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেশি।
কাঁচা মরিচ ১৪০-১৬০ টাকা, কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা।
গত বছরের তুলনায় বেগুন, শসা ও টমেটোর দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি রয়েছে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আমিষের ভরসা ব্রয়লার মুরগি। কিন্তু রোজা শুরুর আগেই এর দাম কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেড়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার ছিল ১৬০-১৭০ টাকা। গতকাল বিক্রি হয়েছে ২০০-২২০ টাকায়। সোনালি মুরগির দাম ৩২০-৩৫০ টাকা, যা আগে ছিল ২৭০-২৯০ টাকা।
তবে ফার্মের ডিমের দাম এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল—এক ডজন ১০৫-১১০ টাকা।
বিক্রেতারা বলছেন, মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে, শীতে খামারে মৃত্যুহারও বেড়েছে। রমজান শুরুর আগেই চাহিদা বাড়া—এটিও মূল্যবৃদ্ধির কারণ।
মাছের বাজারেও দাম বেড়েছে। তেলাপিয়া এখন ২২০-২৫০ টাকা, কয়েক দিন আগে ছিল ২০০-২২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই বা কাতলা ৪০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশি ফলের মধ্যে কলার দাম ডজনে ৩০-৬০ টাকা বেড়েছে। পেঁপে, পেয়ারা, বরই কেজিতে ১০-৩০ টাকা বেশি।
বিদেশি ফলের মধ্যে মাল্টা ৩১০-৩৪০ টাকা এবং আপেল ৩৩০-৪০০ টাকা কেজি, যা দুই সপ্তাহ আগে ৫০-৮০ টাকা কম ছিল।
এদিকে কয়েক দিন ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা।
রমজানের অন্যতম প্রধান পণ্য খেজুর। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, খেজুর আমদানিতে মোট শুল্ক প্রায় ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।
মেডজুল, আজওয়া ও আম্বার জাতের প্রতি কেজি আমদানি খরচ (শুল্কসহ) ৬৪৩-৬৫০ টাকা, মরিয়ম ৬০০ টাকা, সাধারণ মানের খেজুর ৪০০ টাকার কিছু বেশি।
কিন্তু বাজারে এসব খেজুর দ্বিগুণ-তিন গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। বাদামতলীতে মেডজুল পাইকারিতে দেড় হাজার টাকা, খুচরায় ১,৬০০-১,৮০০ টাকা। আজওয়া পাইকারিতে ৭০০, খুচরায় ৯৫০ টাকা। মরিয়ম খুচরায় ১,১০০-১,৩০০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আলি ইব্রাহীম বলেন, নির্বাচনের পরদিন থেকেই পাইকারিতে কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ক্যাব, বিসেফ ফাউন্ডেশন ও শিসউক রমজানে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ১৫ দফা দাবি তুলেছে।
বক্তারা বলেছেন, নতুন সরকারের জন্য এ রমজান হবে এক ধরনের ‘এসিড টেস্ট’। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, নিয়মিত মনিটরিং এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে না।
পল্লবীর বাসিন্দা ও পোশাক কারখানার কর্মী শামসুল ইসলাম বলেন, রোজায় যেসব জিনিসের চাহিদা বেশি, সেগুলোরই দাম বেড়েছে। যেখানে দাম কমার কথা, সেখানে উল্টো বাড়ছে।
রমজান আত্মসংযমের মাস হলেও বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a Reply