বর্তমান বিশ্বে কৃষি সেক্টরে যান্ত্রিকীকরণ ও অটোমেশন একটি আধুনিক চর্চা। জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ বপন, চারা রোপণ,ফসলের পরিচর্যা, ফসল উত্তোলন বা হারভেস্ট এবং প্যাকেজিং সব ক্ষেত্রেই এখন যান্ত্রিকীকরণ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি এই যান্ত্রিক প্রযুক্তিগুলোকে মানুষবিহীন পরিচালনা করার জন্য অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে একদিকে আমাদেও সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের নির্ধারিত কাজের প্রতিটি অংশই পক্ষপাতিত্ব হীন ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ড্রিপ ইরিগেশন, স্প্রিংকলার ইরিগেশন এবং ফগিং ইরিগেশন কৃষি সেক্টরে সয়ংক্রিয় পানি প্রয়োগের তেমনি তিনটি আধুনিক প্রযুক্তির নাম।
ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তিঃ পানির উৎস থেকে কানেক্টর, পাইপ আর ড্রিপারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বিন্দু বিন্দু ভাবে পানি শুধুমাত্র গাছের গোড়ায় পৌঁছে দেওয়াকে ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম বা বিন্দু সেঁচ পদ্ধতি বলে। ব্যবহারঃ যেকোন একক প্ল্যান্ট, ছাদবাগান, বেলকুনি বা বারান্দা বাগান, সিঁড়ির টব, ভার্টিকাল গার্ডেন, ল্যান্ডস্কেপ, ফল বাগান, সবজি বাগান, শস্য ক্ষেত, ফুল বাগান, মসলা বাগান, পাহাড়ী ঢাল, পাহাড়ী সোপান, পানের বরজ, তামাক, ইক্ষু ও তরমুজ চাষে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।উপকারিতাঃ পানি সাশ্রয়ী, সময় সাশ্রয়ী, শ্রম সাশ্রয়ী, অথ সাশর্ ্রয়ী, গাছের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পানি প্রয়োগের সুবিধা, একসাথে সকল গাছে পানি প্রয়োগের সুবিধা, পাম্পের প্রেসার ছাড়া গ্রাভিটি ফোর্সেও পানি প্রয়োগ সম্ভব। সীমাবদ্ধতাঃ একক ও সারী ফসলের বাগানের জন্য এই প্রযুক্তিটি কার্যকর, সাথী ফসল বা মিশ্র ফসলের বাগানে এই প্রযুক্তিটি ব্যায়বহুল ও দেখতে অসুন্দর এবং পরিচর্যা করা কঠিন এবং এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র গাছের গোড়ায় পানি প্রয়োগ সম্ভব।খরচঃ চাষীর বিদ্যমান পানির উৎস (রিজার্ভ ট্যাংক) বা পাম্পের সাথে এই প্রযুক্তি সেটআপে একর প্রতি ৭০০ গাছের জন্য ১ লাখ টাকা খরচ হবে। এবং এই প্রযুক্তিটি প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর স্থায়ী হবে যেটি শুধুমাত্র একজন শ্রমিক বা উদ্যোক্তা নিজেই খুব সহজে
ম্যানেজ করতে পারবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে গতানুগতিক ম্যানুয়াল পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৬৫% অর্থ সাশ্রয় হয়।স্প্রিংকলার ইরিগেশন প্রযুক্তিঃ স্থির পানিকে পাম্পের মাধ্যমে প্রেসার দিয়ে পাইপ ও স্প্রিংকলার নজেলের ভিতর দিয়ে বৃষ্টি আকারে ছড়িয়ে দেয়ার প্রμিয়াকেই স্প্রিংকলার ইরিগেশন বলা হয়। স্প্রিংকলার ইরিগেশন বা কৃত্রিম বৃষ্টি প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি জমির নির্দিষ্ট জায়গা জুড়ে বৃত্তাকারে পানি প্রয়োগ করা সম্ভব। ব্যবহারঃ এই প্রযুক্তিটি ফল বাগান, সবজি বাগান, শস্য ক্ষেত, নার্সারী, চা বাগান, ঘাসের জমি, পাহাড়ী ঢাল, ল্যান্ডস্কেপ, গলফ কোর্স, ফুটবল মাঠ, ক্রিকেট মাঠ,হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট এবং পার্কের সামনে, বৃহৎ এ্যকুয়ারিয়াম এর ভিতরে, ডেইরি, পোল্ট্রি ও আবাসিক ভবনের ছাদের উপরে ব্যবহার করা যায়। উপকারিতাঃ সময় সাশ্রয়ী, শ্রম সাশ্রয়ী, অর্থ সাশ্রয়ী, একসাথে একই জায়গার সকল গাছে পানি প্রয়োগের সুবিধা, সাথী ফসল বা মিশ্র ফসলের বাগানে এই প্রযুক্তিটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর, গাছের সম্পূর্ন অংশ (শিকড়, ডালপালা ও পাতা) ভিজানো সম্ভব। সীমাবদ্ধতাঃ পানির আংশিক অপচয় হয়, গাছের চাহিদা অনুযায়ী জীবনচμের সকল পর্যায়ে পানি প্রয়োগ সম্ভব নয় এবং এই প্রযুক্তির জন্য পাম্প বা মোটর ব্যবহার বাধ্যতামূলক। খরচঃ চাষীর বিদ্যমান পানির উৎস (রিজার্ভ ট্যাংক/ বোরিং/ পুকুর) থেকে পাম্প, পাইপিং, স্প্রিংকলার ও সেটআপ চার্জসহ একর প্রতি যেকোন পরিমান গাছের জন্য প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ হবে। এবং এই প্রযুক্তিটি প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর বা তারও বেশি স্থায়ী হবে। শুধুমাত্র মোটর বা পাম্প অন করার মাধ্যমে একজন শ্রমিক বা উদ্যোক্তা নিজেই খুব সহজে এই সেঁচ পদ্ধতিটি কন্ট্রোল করতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে গতানুগতিক ম্যানুয়াল পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৫০% অর্থ সাশ্রয় হয়। ফগিং বা মিষ্ট ইরিগেশন প্রযুক্তিঃ পানিকে মোটর বা পাম্পের সাহায্যে প্রেসার দিয়ে ফগার নজেলের ভিতর দিয়ে অতি সূক্ষ জলকনায় বা ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন আকারে বাতাশে ঘনীভূত অবস্থায় ভাসিয়ে রাখার প্রক্রিয়াকে ফগিং বা মিষ্ট ইরিগেশন বলে। ফগিং ইরিগেশন বা কুয়াশা সেঁচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি রুম বা শেডের ভিতরের তাপমাত্রা বা আর্দ্র্রতা কন্ট্রোল করা সম্ভব।ব্যবহারঃ এই প্রযুক্তিটি ডেইরি শেড, পৌল্ট্রি শেড, মাশরুম শেড, অর্কিড শেড,ক্যাকটাস শেড, নার্সারী শেড, হাইড্রোপনিক্স ঘাস, মাইক্রোগ্রিন চাষাবাদ, সুপার শপের সবজির দোকান, লোকাল মার্কেটের সবজির দোকান, ওয়ার্কসপ, চা ফ্যাক্টরি,হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ এবং মাদ্রাসায় ব্যবহার করা যায়। উপকারিতাঃ পানি সাশ্রয়ী, সময় সাশ্রয়ী, শ্রম সাশয়ী, অর্থ সাশ্রয়ী, রুমের তাপমাত্রা ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত কমানো সম্ভব এবং ফসল চাষাবাদ ও হারভেস্ট করা সবজি টাটকা রাখতে আদর্শ্র আদ্রতা বজায় রাখা সম্ভব।সীমাবদ্ধতাঃ এই প্রযুক্তিটি মূলত শেড বা রুম এর ভিতরে ব্যবহার উপযোগী, খোলামেলা বাতাশপূর্ন মাঠ ফসলে এই এই প্রযক্তিটি খুব বেশি কার্যকর নয়, এই প্রযুক্তি ব্যবহারে পাম্পের প্রেসার দরকার হয়।খরচঃ চাষীর বিদ্যমান পানির উৎস (রিজার্ভ ট্যাংক/ বোরিং/ পুকুর) থেকে পাম্প, পাইপিং, ফগার ও সেটআপ চার্জসহ বিঘা প্রতি ২৪০ টি ফগার নজেল এর জন্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ হবে। এবং এই প্রযুক্তিটি প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর বা তারও বেশি স্থায়ী হবে যেটি শুধুমাত্র একজন শ্রমিক বা উদ্যোক্তা নিজেই খুব সহজে ম্যানেজ করতে পারবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে গতানুগতিক ম্যানুয়াল পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৫০% অর্থ সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তারা বর্তমানে শখের ছাদবাগান, ভার্টিক্যাল বাগান, হাই ভ্যালু ফল (ড্রাগন ফল, মাল্টা ও আম) ও সবজি (ক্যাপসিকাম) বাগানে ব্যাপকভাবে ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করতেছে। অন্যদিকে বড় বড় বানিজ্যিক উদ্যোক্তারা ফল ও সবজি বাগান এবং মিশ্র ফসলে অল্প খরচে ও সহজে পানি দিতে স্প্রিংকলার ইরিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করতেছে। পাশাপাশি ডেইরি শেড এর তাপমাত্রা কমাতে এবং মাশরুম শেড এর আর্দ্র্রতা বাড়াতে ফগিং প্রযুক্তি এখন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে DRIP IRRIGATION BD LTD.. নামে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ২০২০ সাল থেকেই পাইওনিয়ার কোম্পানি হিসেবে সেঁচের এই তিনটি আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতেছে। তারা একদম মার্জিনাল চাষী থেকে শুরু করে কর্পোরেট লেভেল পর্যন্ত ড্রিপ ইরিগেশন, ফগিং ইরিগেশন ও স্প্রিংকলার ইরিগেশন এর সকল প্রোডাক্ট ও সেটআপ সার্ভিস প্রদান করতেছে। অনলাইনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
(www.dripirrigation.com.bd), সোস্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে অটোমেশন বা সয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অভিজ্ঞ কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান এর সমন্বয়ে তাদের সেবা কার্যক্রম দেশের একদম গ্রাম পর্যায়েও পৌছে দিয়েছে। পাশাপাশি দেশের বাহিরেও তারা তাদের প্রোডাক্ট সরবরাহ করতেছে। বর্তমান সময়টা বিশ্ব উন্নয়নের যুগ, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলেয়ে বাংলাদেশও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বাংলাদেশেও কৃষিক্ষেত্রে AI, IoT এবং Automation প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যান্ত সম্ভাবনাময়। এতে করে আমাদের ভবিষ্যৎ কৃষি আরো সমৃদ্ধ হবে, তরুন উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং খাদ্যের জন্য বহির্বিশ্বের উপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমবে।
Leave a Reply