
মোঃ আমজাদ হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধিঃকুমিল্লা জেলা (উত্তর)
কুমিল্লার দেবিদ্বারে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক জালাল উদ্দিন ফাউন্ডেশন মা, শিশু ও ডায়াবেটিক হাসপাতাল অবশেষে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিল শেষে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ১ জুলাই দেবিদ্বার পৌরসভার বারেরা গ্রামে ২১ শতাংশ জমির ওপর হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৮০ শতাংশ এবং জালাল উদ্দিন ফাউন্ডেশন ২০ শতাংশ অর্থায়নে ২৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ছয়তলা বিশিষ্ট নয় হাজার বর্গফুট আয়তনের এই ভবন। কুমিল্লা অঞ্চলের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক মা, শিশু ও ডায়াবেটিক হাসপাতাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু লিফট ক্রয়সহ নানা জটিলতা ও অনিয়মের কারণে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। প্রথমে ২০২২ সালের জুন এবং পরে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ঠিকাদারের অনিয়ম, দুর্নীতি, ট্রাস্টি বোর্ডের গাফিলতি এবং করোনাকালীন কারণে কাজের গতি কমে যায়। এদিকে হাসপাতালের জন্য ৫ বছর আগে কেনা আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অনেকগুলোই নষ্ট হয়ে যায় বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়ে। তাছাড়া কোনো ধরনের সেবা না দিয়েও ফাউন্ডেশনকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এবং নিরাপত্তা প্রহরীসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতি অভিযোগ
প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয় লিফট ক্রয়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পি.সি এড এম.এস.সি (জেডি)-এর মালিক হাজী মো. কেফায়েত উল্লাহ আসল জাপানি হিটাচি কোম্পানির পরিবর্তে মিতাচি কোম্পানির নকল লিফট সরবরাহ করেন। এর ফলে প্রকল্প কার্যক্রমে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে। পরবর্তীতে দু’বছর পর প্রকৃত হিটাচি কোম্পানির লিফট স্থাপন করা হয়।
এছাড়া চাকরি দেওয়ার নামে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রত্যাশীরা টাকা ফেরতের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জালাল উদ্দিন ফাউন্ডেশন নতুন করে ছয় সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে। তারা জানায়, নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে ফাউন্ডেশন। আগামী সেপ্টেম্বরেই হাসপাতালটি চালু করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে উদ্বোধনের আগে নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম পরিবর্তন করতে প্রায় এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে।
পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি একেএম মফিকুল আলম কামাল জানান, হাসপাতালটি চালু হলে স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা সংকট থেকে মুক্তি পাবে। তিনি বলেন, “ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা, মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে উদ্যোগ এবং অসহায়-দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হবে।”
দেবিদ্বার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বরুণ কুমার দাস বলেন, সরকার এই প্রকল্পে ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করেছে। তবে হাসপাতালের নিয়োগ ও বেতনভাতার দায়িত্ব ফাউন্ডেশনের হাতে থাকবে। সরকারি পর্যায়ে নিয়োগ বা জনবল প্রদান করার সুযোগ নেই
দীর্ঘ পাঁচ বছর অব্যবহৃত থেকে থাকা এই হাসপাতাল চালু হওয়ার খবরে দেবিদ্বারের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, এ হাসপাতাল চালু হলে উপজেলার পাশাপাশি আশপাশের এলাকাগুলোর মানুষও আধুনিক চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
Leave a Reply