
শফিকুল ইসলাম সোহেল, ঢাকা জেলা (উত্তর) প্রতিনিধি:
বহুল প্রতীক্ষিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচণ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল ১১ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। এ নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে প্রশাসন। সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করেছেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্পাস জুড়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হবে জাকসু নির্বাচন। একইদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্য অনুসারে নিউজটি লেখা পর্যন্ত এবারের নির্বাচনে ১১ হাজার ৮৯৭ জন ভোটারের বিপরীতে ১৩ হাজার ৩ শত টি ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬ টার পরে নির্বাচন কমিশনারদের মিটিং শেষে সঠিক সংখ্যাটি জানানো যাবে। সে ক্ষেত্রে পূর্বের দেয়া সংখ্যা থেকে কিছুটা কম বেশি হতে পারে । সর্বশেষ নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে জাকসুর ২৫ টি বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৭৭ জন প্রার্থী।
প্রস্তুত প্রশাসন: মঙ্গলবার (০৯ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনের তরফ থেকে ফের নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার জেলা প্রশাসক এর সহযোগিতা চেয়েছেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন, নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রাশেদুল ইসলাম।
এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, আরাফাতুল ইসলাম জানান, ডিবি পুলিশ সহ ১৫ শ পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর ৩ শত সদস্য সহ মোট ১৮ শত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন কমিশনার সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রাশেদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভোটের দিন মোট ২১টি হলে ভোট কেন্দ্র থাকবে এবং বুথ সংখ্যা হবে ২২৪টি । ১১টি ছেলেদের হল ও ১০টি মেয়েদের হলে ২১জন রিটানিং কর্মকর্তার পাশাপাশি ৬৭ পোলিং অফিসার ও ৬৭ জন সহকারী পুলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। কেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় ৮০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে এসকল সিসি ক্যামেরা দিয়ে কেন্দ্রের পরিবেশ মনিটরিং করা হবে।
এছাড়াও নির্বাচনে ওএমআর ব্যালট পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। ব্যালট পেপার গুলো মেশিন রিডায়াবল হওয়াতে ভোট গণনা হবে স্বল্প সময়ের মধ্যে।
জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সমন্বয়ে মনিটরিং টিম, প্রক্টরিয়াল বডি এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পুরো ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করবেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩ পাতা এবং দুটি হলের জন্য ২ পাতা ও বাকি হলগুলোর জন্য ১ পাতার ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে। এবং ভোট দেয়ার নিয়ম কানুন এর উপর একটি ভিডিও ফুটেজ তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে।
একজন ভোটার কোন কারণে ব্যালট পেপারে ভুল করার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জানালে ঐ ব্যালট পেপার বাতিল করে, নতুন ব্যালট পেপারে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে বলেও জানান এই নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব।
প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট: এদিকে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের দাবীর প্রেক্ষিতে শেষ সময়ে প্রার্থীদের আজ ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টা হতে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত জাকসু’র কেন্দ্রীয় প্রার্থীদের নমনুা সংগ্রহ করা হয় এবং দুপুর সাড়ে ১২টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হল সংসদের প্রার্থীদের নমুনা সংগ্রহ করা হলেও অনেক প্রার্থী ডট টেস্টে আসেনি। তাই সেই সময় সীমা বারিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর সারাদিন ডপ টেস্ট চলতে থাকে। এ বিষয় নির্বাচন কমিশন ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত।
আনুষ্ঠানিক প্রচরণা শেষ: গত ২৮ আগস্ট বিকেল চারটা থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছিল জাকসু নির্বাচনের। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত বারোটায়। এই সময়ের পর কোন প্রার্থী প্রকাশ্যে প্রচারণা চালালে তা আচরণবিধির লঙ্ঘন হবে। তবে বেশিরভাগ প্রার্থীরাই অনলাইনে এবং গোপনীয়তার সাথে তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জাকসু ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমস্যা সমাধান ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরী করবে এমন প্রত্যাশা সকলের ।
জাকসুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল, ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেল, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্ট সমর্থিত প্যানেল সংশপ্তক পর্ষদ, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের একাংশের প্যানেল সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলসহ বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলে ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, গত কয়েকদিনের প্রচারণায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। জয় পরাজয় নয় জাকসু নির্বাচন বাস্তবায়িত হচ্ছে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক সাড়ায় জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছে ।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাদের প্যানেল সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী শেখ সাদী হাসান বলেন,
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী হিসেবে যখন প্যানেলের সকলকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষর্থীদের কাছে যাচ্ছি, হলে, বিভাগে এবং শিক্ষার্থীদের আড্ডাস্থলে সবাই খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদেরকে গ্রহণ করছেন। শিক্ষার্থীদের সকলের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। বিষয়টি জাকসুতে জয়ের ব্যাপারে আমাদেরকে আরো বেশি আশাবাদী করে তুলেছে। আমরা সকলে দেখেছি গত ১৫ বছরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল ছাত্র সংগঠনের নামে কর্তৃত্ববাদী ছাত্র সংগঠন। যাদেরকে আমরা মাফিয়া সংগঠন বলি। যদি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে জাকসুতে নির্বাচিত হতে পারি তাহলে অবশ্যই শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করবো। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে সকলকে নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। শিক্ষার্থীদের মতামতের উপর ভিত্তি করে অধিকার আদায়কে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আরিফ উল্লাহ বলেন, বিভিন্ন হলগুলো প্রচারণা শেষ করেছি। আমাদের প্যানেল পরিচিতি ও ইশতেহার সকল শিক্ষার্থীর মাঝে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি। আশা করছি সুন্দরভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, একজন ভোটার কোন কারণে ব্যালট পেপারে ভুল করার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জানালে ওই ব্যালট পেপার বাতিল করে নতুন ব্যালট পেপারে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। এ কারণে কিছু অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে। এছাড়া ব্যালট সরবরাহকারীরা ১০০ টি ব্যালটে এক সেট হিসেব করেন। একারণে সেট হিসেবে ব্যালট দেয়ায় কিছু ব্যালট বেশি আনতে হয়েছে। তবে কেন্দ্রগুলোতে ভোটার সংখ্যা অনুসারে ব্যালট পেপার দেয়া হবে। অতিরিক্ত ব্যালট পেপারের প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশন এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
সকলের প্রত্যাশা অনেক, গণতান্ত্রিকচর্চায়, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে জাকসু গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এমনটি প্রত্যাশা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলে। জাকসুতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্র-ছাত্রীদের মতামত প্রতিফলিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিবলী নোমান বলেন, দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখা প্রয়োজন, কারণ জাকসু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। প্রত্যাশা থাকবে জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি বাছাইয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ করে তুলবেন। একই সাথে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও তাদের পদসমূহের কার্যপরিধির আলোকে কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক, সাংস্কৃতিক ও পাঠ-বহির্ভূত কার্যক্রমকে গতিশীল করবেন।
পরিশেষে আগামীকাল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাকসু নির্বাচন হবে এটাই সবার প্রত্যাশা।
Leave a Reply